গল্প হলেও সত্যি


আমি সে ও সখী


একদিন বাড়ির সামনের রাস্তায় দেখে চমকে উঠলাম, একটা বছর চারেকের প্যাঙলা বাচ্চা—'একটুর জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়া' প্রাকটিস করছে ! দুর থেকে যে গাড়িগুলো খুব জোরে ছুটে আসছে, সে রাস্তার ধারে ছোটবার জন্য ওত পেতে দাঁড়িয়ে। গাড়িটা একেবারে সামনে এসে পড়লে ছুটে তাকে ক্রস করে যাচ্ছে। বারংবার এই ভয়ঙ্কর কাণ্ড দেখে আমি তার হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে হাত ছাড়িয়ে আমাকে এক ঘুষো মেরে ছুটে পালাল। ইতিমধ্যে আমি আলাপ জমানোর জন্য তার দিকে মিঠে, কড়া ও মোলায়েম তিন চোখেই তাকিয়েছি। পাত্তাই দেয় না। পাড়ায় ওর বিরাট চাহিদা—বিশেষ করে দাদু মহলে। আমি ওর মাকে গিয়ে বললাম, এতো গাড়ি চাপা পড়বে। ওর মা একটা ফাটা ক্যাসেট বাজালো, বললে—'কি করবো? পরের বাড়ি, তালা দিয়ে তো রাখতে পারি না, এই তো হাওয়াই চটি কিনে দিয়েছি , ফেলে গেছে....শহর বাজার, সে গ্রামে যা করতো এখানেও তাই..., সব্বাইকে মেরে বেড়াচ্ছে, গাছে ঢিল ছুঁড়ছে , সেই ঢিল লোকের জানলায়...ওর বাবা পেটাই করে...চতুর্দিকে আবার প্রশ্রয়, তাতেই মাথায় উঠেছে। আপনি বলে দেখুন...।' তার ক'দিন পরে দেখি এক ফ্ল্যাট বাড়ির গেট দিয়ে আমার নানান বয়সের বান্ধবীর দল—' মারলো রে, মারলো রে...' করে সভয়ে বেড়িয়ে আসছে। আর পেছনে ঘুষি বাগিয়ে সেই দস্যি ছেলেটা যে ছুটে আসা গাড়ি থেকে একটুর জন্য বেঁচে যাওয়া প্রাকটিস করে! মুহূর্তের মধ্যে আমি মনস্থির করে ফেললাম, এভাবে হবে না, সমানে সমানে লড়তে হবে। খপ করে তার ঘুষো শুদ্ধ হাত খানা ধরে গর্জে উঠলাম—কি ভেবেছিস তুই, এ পাড়ায় তুই ছাড়া আর কেউ মারপিট করতে জানে না? সে একটুও ভয় না পেয়ে রেগে-টেগে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। এই সুযোগে একটা বছর চারেকের মেয়ে দুম করে তাকে মারলে এক ঘুষো। ঘুষো মেরেই সে আমায় শুনিয়ে অন্যদের সাক্ষী মেনে বললে—'বিনা করণে আমি কাউকে মারি বলতো? ও শুধু শুধু মারে'! এতটুকুন মেয়ের কাছে ঠুসো খেয়ে সে কেমন যেন বমকে গেল। সেই সুযোগে আমি খুব ভৎসনার সুরে সে ছেলেকে বললুম—ছিঃ ছিঃ তুই মেয়েদের মারিস! কই আয় দেখি আমার সঙ্গে কেমন মারপিট করতে পারিস...। এই সরাসরি চ্যালেঞ্জে তার ঘুষো পাকানো হাত একবার উঠেই আবার নেমে গেল। কিন্তু চোখ আগুণের ভাটার মত জ্বলছে। পরদিন আমি তাদের হাউজিং এ উঁকি মেরে দেখি, জলখেয়ে ফুলে ঢোল, বিশ কিলো ওজনের একটা খুব পুরনো ধরনের লোহার নজেল দেওয়া ৭ নম্বর ফুটবল, যা দিয়ে আমরা ছোটবেলা খেলতুম এবং জখম হতুম তাই দিয়ে গ্যারাজের দেওয়ালে বলে লাথি মারছে। তার সরু টিংটিঙে পা দুখানিতে যথেষ্ট লেগেছে, খোঁড়াচ্ছে তবু কুছ পরোয়া নেই ভঙ্গিতে বলে লাথ কষছে। আমি বেশ মোলায়েম করে বললুম—আমাকে দাদু বল...সে ফিরে মাত্র না চেয়ে শুধু আমায় গলা চিনে বেশ রাগের সঙ্গে বলল, 'আমার দাদু আছে।' এবার অফার দিলুম, আমায় দাদু বললে দারুণ বল এনে দেবো, এক হাই মারলে আকাশে চলে যাবে। পায়ে একটুও লাগে না। তাইতে সে এবার চাইলে। তার মা বললো— ' না দাদু বলবি না, আমরা বলি দাদা, তুই বলবি জেঠু বাবা।' একটু পরে আর এক বাড়ির কাজের মেয়ে এসে হাওয়াই চটির স্ট্রিপ দিয়ে বানানো এক গুলতি ছুঁড়ে দিয়ে বললে—' কার বাড়িতে ঢিল ছুঁড়েছে তাই ওর পিসি বলে আমায় দু কথা শুনিয়ে দিলে! বলে সারাদিন টো টো করে যাতে না ঘোরে তার জন্য তালা দিয়ে রাখতে বল।' ওর মা পিঠে এক ঘা দিতে সে সত্যি কথাই বললো— 'হাওয়াই চটি দিয়ে গুলতি হয় বুঝি, ঢিলটা যেখানে সেখানে চলে যাচ্ছে, তার আমি কি করবো ? বাবা বলল গুলতি এনে দেবো....।' সত্যি গুলতির রাবার আলাদা, তার একটা ইলাস্টিক টেকনোলজি আছে, হাওয়াই চটির স্ট্রিপ দিয়ে হয় না। তাছাড়া আমিও একখানা গুলতির কথা ভাবছিলাম। উদ্দেশ্য ওর আর আমার একই। এক দুর্ভাগা প্রমোটারের আদালত কেসে বেঁচে যাওয়া জমিতে এক জনগণের আম গাছ উঠেছে, ঝাঁকিয়ে আম হয়। কি জাত জানি না্‌, খুব স্বাদ। ফ্যাটবাড়ির লোকরেদেরও চেখে দেখার খুব সাধ কিন্তু গাছে ওঠার সাধ্য নেই। তাঁরা সে গাছে আম রঙা টিয়া পাখি বসা দেখেন আর গ্রাম থেকে আসা কেয়ারটেকার বাপ মায়ের এমনই ছেলের দল তার শাখে শাখে চক্কোর মারে। তা নিয়েও নিজেদের মধ্যে খুব উত্তেজনা। দুটো গুলতি থাকলে বারান্দা থেকে আমি আর রাস্তা থেকে সে তা দিয়ে অব্যর্থ লক্ষ্যে ঢিল ছুঁড়ে বেশ আম শিকার করা যাবে। ঈশ্বরের এক অদ্ভুত ব্যাপার দেখি—তিনি আমি কিছু চাইলে দেন না , কিন্তু কারও উপকার করতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে...সেদিন চৌরঙ্গির প্রেস ক্লাবের পেছন দিয়ে থেকে বেড়িয়েছি— দেখি, যেখানে বিহারি লেবারদের জন্য মাথার খুলি পায়ের হাড় এসব দিয়ে জড়ি বুটি ইত্যাদি বিক্রি হয় গুলতিও বিক্রি হচ্ছে। কালো, লাল রঙের বাবার স্ট্রিপ হাড়ি কাঠের মতো হ্যান্ডেলের দু দিকে লাগানো—বেশ যন্তর একখান। খান চারেক। দুটো স্টকে থাকবে। গুলতি খানা তার হাতে দিয়ে বললাম—এইটে তোর আর এটা আমার, আমরা আম শিকারে বেরবো। তার মা খুব অবাক হয়ে বললে—'দাদা'! আমি বললুম তুই অত ঘাবড়াচ্ছিস কেন, আমি তো আছি। এতে দেখলুম সে ছেলের আঁখ পালটি হয়ে গেল, আমার ওপর একটা আস্থার ভাব। আমরা অ্যাকশনে নেমে পড়লুম। সে দশ পনেরো বারের চেষ্টায় চার পাঁচটা আম পেড়ে ফেলল। আমি কয়েক বারের চেষ্টায় ক্ষান্ত দিলুম। এতে আঙুলের যা পরিশ্রম, ব্যথা তার থেকে আঙুল দিয়ে লিখে লেখক হওয়া সোজা। মধ্যমাটিকে অন্তত চল্লিশ ডিগ্রি পেছনে বেঁকাতে হবে। কোন ছোটবেলা মার্বেলগুলি খেলতে ওই মধ্যমাটিকে পেছনে টানতে হোত। আরও সমস্যা— সে অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য তো লক্ষ্যভেদ শিক্ষায় ঠিকই বলেছিলেন—এ জগতে ওই পাখিটি থুড়ি ওই আমটি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়লে হবে না। কিন্তু গুলতি ছুঁড়তে গিয়ে আমার আমার চোখে ধরা দিচ্ছিলেন গাছের উল্টো দিকের বারান্দায় ক্রুদ্ধ এক পুলিসের প্রাক্তন বড় কর্তা। তারপর নীতিগত ভাবে হেভিলি স্ট্রং তার এক পাড়াতুতো দাদু চলে এলো, তিনি আমায় যথাযথ ভাবে খুব ভৎসনা করে বললেন—'ছিঃ ছিঃ এতটুকু ছেলেকে ঢিল ছুঁড়ে কেউ আমি পাড়ায়! ও গরিব বলে বুঝি?' যাক গে। আমি একটিও আম পাড়তে পারি নি দেখে সে ছেলের কি আনন্দ। দুয়ো দিয়ে বললে, 'অত সোজা না।' আমি ম্যানেজ দিয়ে বললুম, দুজনে পাড়লে ওরা্‌ রেগে যাবে না ? তাই...।' সে দয়া দাক্ষিণ্যে আমাকে একটা আম দিলো। এই ভাবে বন্ধুত্ব বেশ একটু গড়িয়ে যেতে আমি জিজ্ঞেস করলুম তোর নাম কি রে ? তাইতে সে মুনাব্বর খান গোছের নবাব বাদশাহ মতো একটা নাম গড়গড়িয়ে বলে গেল। আমি বললুম, ধুত, তোর নাম তো বাবু, সে মিচকে হেঁসে বললে—'আমার গ্রামের দাদু আমাকে বাবু ডাকে, তুমি কি করে জানলে!' আমি বললুম, আমিও তোর দাদু তাই। আজ থেকে আমি দাদু আর তুই বাবু। পাড়ায় আমাদের নামকরণ পর্ব সমাধা হতে তার তুতো বোন এই এতটুকুন এক ফুটফুটে চাঁদের বুড়ির সঙ্গে আলাপ। তার নাম আলপিয়া। প্রথম যেদিন দেখি, সে গ্যারাজের মলিন আলোয় পড়ছে। তার গা থেকে ঠিকরে বেরচ্ছে চাঁদের আলো...। একদিন দেখি তার মা তাকে বোতাম আঁটা রেডিমেড শাড়ি পড়িয়ে প্রি প্রাইমারি ইংলিশ স্কুলে ভর্তি করতে যাচ্ছে। দেখাচ্ছে যেন, দেবী সরস্বতী ছোটবেলায় এভাবেই আশ্রমে পাট নিতে যেতেন। তারপর দেখি বাবুর  সঙ্গে আলপিয়ার কি ভাব আর কি মারামারি। দুজনের পারস্পরিক একটিই অভিযোগ—'ওর সব কতা মিত্তে জানতো'। আমি চাঁদের বুড়িকে বললাম—তুই বিউটিফুল। এর সঙ্গে সে জুড়ে দিলে, 'কেলাসে ফার্স্ট'। আমি তো দেখা হতে দুটোই বলি, কিন্তু তাতে সে সন্তুষ্ট নয়, বলে 'কেউ জানে না।' তখন আমি রাস্তা দিয়ে যে যায় তাকেই ডেকে জিজ্ঞেস করি, দেখতে কেমন ? সে বলে বিউটিফুল। আমি বলি, তার ওপর ক্লাসে ফার্স্ট। ফুটফুটে চাঁদের বুড়ি আনন্দে আমার হাত ধরে চতুর্দিকে ঘুরপাক খায়। কিন্তু আমি যখনই সে লোকটিকে বলি, একটাই দুঃখের কথা জানেন—একটাও সত্যি কথা বলে না, সবই কথাই কি মিথ্যে কথা! তখন সে রেগে গিয়ে আমাকে দুমদাম ঘুষো মারতে থাকে। যা বললাম তা কিন্তু ভুল নয়। একদিন আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, বাবু কোথায় রে ? সে বললে—' ও গ্রামের বাড়ি ভেগেছে, চলো আমরা আইসক্রিম খেতে যাই।' তারপর আমরা যখন ফিরছি দেখছি বাবু গ্রামের বাড়ি যায় নি— আমাদের খুঁজে না পেয়ে সে দুর থেকে ছুটে আসছে। আমি কিছু জিজ্ঞেস না করতেই চাদের বুড়ি ওজর দেখিয়ে বললে—'তাহলে ওর মা মিথ্যে করে বললে কেন!' শুধু মিথ্যে না চাঁদের বুড়ি খুব ঝগড়ুটেও বটে। একদিন আমি আর বাবু খুব এক চোট বৃষ্টির জমা জলে দাঁড়িয়ে জলটা আরটু বাড়লে আমরা সাঁতার দেব প্ল্যান করছি, সত্যি না মিথ্যে জানি না বাবু বলছে, গাঁয়ের পুকুরে নাকি সে চারবার এপার ওপার করে। হঠাৎ কোথা থেকে আলপিয়া এসে ঝগড়ার মুডে বললে—'আমাদের গাঁয়েও অনেক কুকুর আছে!' লে হালুয়া এবার কুকুর আর পুকুর নিয়ে আমাদের তিনজনের ঝগড়া লেগে গেল। বানিয়ে বলায় বাবুও খুব পিছিয়ে নেই। তবে তার সকল মিথ্যেই বীরত্বব্যঞ্জক। যেমন, গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে তার বাপ মা ভোট দিতে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল তাকে নিয়ে। ভোটের দিনে প্রবল মারপিট দেখে তার মন মজেছে। আমাকে অনুপুঙ্খ সচিত্র বর্ণনা দিয়ে সে বললে, মারপিটে সেও নাকি দৃপ্ত অংশগ্রহণ করেছে। আমি জিজ্ঞেস করলুম— তোকে মারপিট করার কি কি দিল ? সে চমকে দিয়ে বলল, 'ছবি দিয়েছে' ! ছবি? সে এক ছুট্টে গিয়ে সেই অস্ত্র নিয়ে এলো—এক পার্টির নির্বাচনী প্রতীক দেওয়া বুকে আঁটার ব্যাচ, যা সে 'বীরউত্তম' শিরোপার মতো মস্ত বড় সম্মান হিসাবে সযত্নে রেখে দিযেছে। তার বীরত্ব ও ব্যাচ প্রাপ্তির জন্য তাকে ঈষৎ হিংসার দৃষ্টিতে যথোচিত সম্মান করায় সে এবার নিজেকে উন্মুক্ত করে দিয়ে বললে, 'দাদু আমি মারপিট  করবো'। আমি বললুম—' আমিও করবো'। তাইতে আমাকে সে খুব হেলাফেলা করে বললে, 'তুমাকে লিবে না, ঠেলে ফেলে দিবে'। এইভাবে অপমানিত হয়ে আমি প্রায়ই তাকে নানান মারপিট অনুষ্ঠান, যাতে আমাকে যোগ্য হিসাবে নিয়েছে যেমন পরস্পরের দিকে ইট ছোঁড়া, মুখে মাথায় লাগতেই পারে ইত্যাদিতে...। এতে সে শিউরে উঠে আমাকে সাবধান করে বললে, 'ওরে বাবা মুখে মাথায় ইট লাগবে যেও না দাদু।' এর পর থেকে উল্টে সে আমায় সাবধান করতে লাগলো—গাছে উঠো না, পড়ে যাবা। রাস্তার জল নোংরা সাঁতার দিতে নাই, জ্বর আসে। ইট লাগলে মুখ ফেটে যায়, রক্ত পড়ে....ইত্যাদি। আমি তো একটাও জানি না তাই আমাকে একশ রাইমস শোনায়—একবারও রিকোয়েস্ট করতে হয় না। আমি ইংলিশে নিজের নাম লিখতে পারি না, তাই শুনে সে সহানুভূতির সঙ্গে বলল—' তোমার ভাল নাম কি বলতো আমি ইংলিশে লিখে দিবো'। এর পরে আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করলুম, তোরা তো মুর্শিদাবাদের গ্রামের লোক আমরাও তাই, দেখছিস তো কথা বলি একই টানে, কিন্তু দেশের বাড়িতে যাস কি করে ? সে বললে 'টেরেনে।' আমি বললুম, সে ইস্টিশান, টেরেনের কথা আমিও জানি, কিন্তু উঠতে দিবে ? আমার এতদূর অজ্ঞতা দেখে সে আর হেঁসে বাঁচেনা, বললে—'ইস্টিসনে টিকিটের দোকান আছে জান না! টিকিট কিনলেই উঠতে দিবে, আচ্ছা বাবাকে বলে দিব তুমাকে লিয়ে যাবে।' এই ভাবে সে অনেকটা বুঝে গেল, বয়স হলেই সবার— যেমন আমার, তেমন বুদ্ধিশুদ্ধি হয় নি। তবেও বন্ধুত্বের সঠিক পথ বিষয়ে আমার ধন্দটি গেল না। কিছুটা যেন সমঝদারিতে এলো ওদের নিয়ে চিড়য়াখানায়। এক ঘোর বরষার দিনে আমরা তিনজনে আলিপুর চিড়িয়াখানায় এলাম। তারা সব ঘুরে দেখলে, হাতে খাওয়ালে চোখের দিকে নিথর তাকিয়ে। ছবির জ্যান্তো বই দেখা আর শেষ হয় না, টেনে আর একটা খাঁচায় নিয়ে যেতে হচ্ছে। আলপিয়ার মতো বকরমবাজ একদম নিশ্চুপ হাঁ হয়ে গেছে। বাঘ সিংহ, হাতি জেব্রা...নানান পাখি—জ্যান্ত ছবির বই দেখা যেন আর শেষ হয় না। বাবু আর আলপিয়ার ভাব ভালবাসা বেশি অতিকায় প্রাণীদের...., বর্ষাকালে ওদেরও বুঝি জঙ্গলের কথা মনে পড়ে, খাঁচা ছেড়ে খোলা জায়গায় বেড়িয়ে এসেছে সবাই, টইটুম্বুর খালে স্মান সারছে, নিজস্ব সুরে ও স্বরে, মন মোর মেঘের সঙ্গী...গাইছে। বাবু দেখি ঠায় ওদের দিকে তাকিয়ে। তারপর এক কাণ্ড বাঁধে আর কি। —হাতির সামনে দিয়ে সে বারকয় ঘুরলো, পায়ে চেন বাঁধা হলেও হাতির এনকোক্লোজা নেই , বাবু একেবারে কাছে চলে যাচ্ছে আর ঘুরে ফিরে ওই— হাতির চোখে দেখছে। তারপর হঠাৎ হাতিকে ঘুষো মারার জন্য দৌড়ে যেতে আমি খপ করে তার হাতখানা ধরে ফেললাম। বহুবার ইন্টার্ভিউ করে জানতে চাইলাম, হা্‌তির সঙ্গে হাতাহাতির ব্যাপারখানা কি ? সে যা বললো তা উড়িয়েও দিতে পারলাম না। সে বললে, 'বাঘ , শিম্পাঞ্জি সবাই আমাকে দেখেছে, ঘাড় ঘুরিয়ে বারবার দেখেছে, খালি এই হাতির বাচ্চা, এত সামনে ঘুরলাম আমাকে একবার চেয়েও দেখলো না!' বুঝলাম, পরাজিত মহাবলী পুরু, আলেকজান্ডারকে যা বলে ছিলেন এও তাই— রাজার প্রতি রাজা যে ব্যবহার করেন তাই প্রত্যাশা করি। বাবু আমাদের পাড়ার রাজা, বাঘ, সিম্পাঞ্জি— সবাই তা মেনেছে, ওকে পাত্তা দিয়েছে, চেয়ে দেখেছে, কিন্তু বলদর্পী গজরাজ বাবু ক্ষুদ্র বলে তাকে অবহেলা করেছে—চেয়ে দেখে নি। উপস্থিতিই স্বীকার করে নি। তাইতে বেপাত্তা হওয়া সবার মতো সে অভিমানহত হয়ে তাকে ঘুষো মারতে গেছে। এবার আমার আর আলপিয়ারও হাতিটার ওপর খুব রাগ হতে লাগলো। —'আসলে ব্যাটা হাতিটা মাথা মোটা।' একটা লাগসই যুক্তি পেয়ে বাবুর মনটা ঠাণ্ডা হলো। মনের ঝাল জিভে ঝাড়লাম, বাইরে এলে ঝাল আর নারকোল দিয়ে ঝালমুড়ি খেয়ে।

হায়, করোনার তাড়ায় তারা গাঁয়ের লোক গাঁয়ে ফিরে গেছে। বন্ধুতো সহসা পাওয়া যায় না, বন্ধু বিহনে বড় একা হয়ে গেছি।    

                  

Comments